144690

আমরা কারা?

মাঝপথে হঠাৎ-ই গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেলো। এই গভীর রাতে আশেপাশে কোন গাড়ি সারাবার দোকানও নেই। শুধু একটা সবুজ রঙের বাড়ি পথের ধারে।
 
মানুষটি ভাবলো, আজ রাতে এখানেই আশ্রয় নেয়া যাক।দরজায় নক করতেই খুলে দিলো যুবক বয়সের চটপটে এক ছেলে। কি চাই? মানুষটি গাড়ি দেখিয়ে বললো, গাড়ি নষ্ট হয়েছে। আজ রাতে যদি একটু থাকতে দিতেন, খুব উপকার হতো।

 
শীতের রাতে ঝরঝরে উষ্ণ পানিতে গোছল করতে পেরে মানুষটির মন খুশি হয়ে গেলো। এসে দেখে তার জন্য টেবিলভর্তি গরম খাবার। পেট পুরে খেয়ে গৃহকর্তার প্রতি প্রসন্ন মনে ঘুমাতে গেলো।
 
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। বাড়ির ভেতরের কোথাও থেকে অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ আসছে। বাতাসে কোথায় যেন ফিসফিস করে চলেছে মহাকাল। ভীত কন্ঠে মানুষটি চীৎকার করে উঠলো, কে? কে ওখানে? কাছেই কোথাও যেন বজ্রপাতের সাথে সাথে থেমে গেলো সেই আওয়াজ।

 

 
সুন্দর সকালের মিষ্টি আলোয় ঘুম ভেঙ্গে গেলো। গত রাতে যেন এখানে কিছুই ঘটেনি! ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে থরে থরে নাস্তা সাজানো টেবিলে। খাওয়া শেষ হতেই উদয় হলো চটপটে তরুনটি। হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলো পেট ভরেছে কিনা, কোন সমস্যা হয়েছে কিনা। মানুষটি ইতস্তত করতে করতে গতরাতের শব্দটার কথা বললো। সে জানতে চাইলো শব্দটির কারন ও উৎস। ছেলেটি গভীর স্বরে প্রথমে ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে চাইলো। মানুষটি চাপাচাপি করায় ছেলেটি বললো, সেটা জানতে হলে আপনাকে খুব কষ্ট করতে হবে, আপনি কি সেটা করতে রাজি আছেন?
 
মানুষটি জিজ্ঞাসা করলো, কিরকম? ছেলেটি বললো আপনাকে দেখতে হবে এই পুরো পৃথিবীটিকে, ঘুরতে হবে সব খানে, যেখানেই মানুষের উপর নিপীড়ন হচ্ছে, অত্যাচার চলছে, মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, যেতে হবে সেখানে। আপনি যা দেখবেন তার উপর আপনাকে পরীক্ষা করা হবে।যদি সে পরীক্ষায় আপনি উতরে যান, তাহলে আপনাকে জানানো হবে শব্দের উৎস। আরো অনেক কিছু জানতে পারবেন যা ছিলো আপনার অজানা। আমরা আপনার গাড়িটি সারিয়ে দিয়েছি, নিশ্চিন্তে নিজ গন্তব্যে যেতে পারেন।
 
কৌতুহল মানব জাতিকে আদিম অতীত থেকে চালিত করে এসেছে বর্তমানে। এই মানুষটিও তার ব্যাতিক্রম নন। তিনি গেলেন ইরাকে।শিয়া সুন্নীদের হত্যাযজ্ঞে তার একবার কলার চেপে ধরা হয়েছিলো। এই তুই শিয়া না সুন্নী? আমি হিন্দু! কোনরকমে পালিয়েছে সে। গেলেন নাইজেরিয়াতে, দেখলেন বোকো হারাম কিভাবে মানুষকে ধর্মের নামে হত্যা করছে, বাচ্চামেয়েদের বিক্রি করছে, ধর্ষন করছে। গেলেন প্যালিস্টাইনে, ধর্মের নামে জমি দখলের জন্য মোসলমান-ইহুদী মেরে চলেছে একে অপরের সন্তানকে। গেলেন সিরিয়াতে, আইসিস এর ভয়াবহ আক্রমনে দেখলেন এক গ্রাম ভর্তি মানুষের মুহূর্তে নিশ্চিনহ হয়ে যাওয়া। নদীতে ভেসে চলেছে লাশ। শকুনে ঠুকরে খেয়ে নিয়েছে তাদের চোখ। শুন্য কোটর চেয়ে রয়েছে তার দিকে। আর লাখ লাখ মানুষ নৌকায় করে পাড়ি দিচ্ছে সমুদ্র। জানে না আদতে অন্য পাড়ে পৌঁছাতে পারবে কিনা। গেলেন মালয়েশিয়া, দেখলেন নৌকায় করে পাড়ি দেয়া মানুষদের গণকবর। বনে জঙ্গলে ক্যাম্পে ক্যাম্পে না খেতে পেয়ে ধুকছে মানুষ, মরছে প্রতিদিন কয়েকজন।
 
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, অনেক হয়েছে। এবার বুঝি ফেরার সময়। চোখের নিচে যেন জমেছে অভিজ্ঞতার ঝুলি। ক্লান্ত দেহে তিনি পৌঁছুলেন সেই সবুজ বাড়িতে। দরজা খুলে স্মিত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি বললো, আপনি অনেক ক্লান্ত, বিশ্রাম নেন। কালকে কথা হবে।
 
সেরাতেও মানুষটি ঘুমাতে পারলোনা। কোন এক অপার্থিব উৎস থেকে শব্দ আসছে, ঠাস, ঠাস…
 
পরদিন ভরপুর নাস্তার পর যুবকটি তাকে জিজ্ঞাসা করলো, কি বুঝলেন পৃথিবী ঘুরে? মানুষটি বললো, মানুষের উপর মানুষের এমন অত্যাচার সহ্য করা যায় না। ধর্মের নামে, সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে, জায়গা জমির দাবীতে, তেলের লোভে, অস্ত্র ব্যাবসার লোভে, সামান্য টাকার লোভে মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে, অত্যাচার করতে পারে জানা ছিলো না।
 
যুবকটি জিজ্ঞাসা করলো, যে সকল স্থানে গেছেন, সে সব স্থানে কতোজন মানুষ মারা গেছে? সঠিক সংখ্যাটা বলেন। মানুষটি ক্ষেপে গেলো। ফাইজলামি পাইছেন মিয়া? হাজারে হাজারে মানুষ মরেছে, লাখে লাখে। কেউ গুলি খেয়ে মরছে, কেউ না খেয়ে। কেউ পালাতে গিয়ে নদীতে বা সাগরে ডুবে। দল বেধে হত্যা করে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। কারোবা লাশ পচে মিশে গেছে মাটির সাথে। কাউকে মেরেছে জ্যান্ত পুড়িয়ে। কেউ মারা গেছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, কেউ বা মারা গেছে শরনার্থী ক্যাম্পে। ওষুধের অভাবেই মারা যাচ্ছে হাজার হাজার। সাথে সংক্রামক ব্যাধি ও নিপিড়ন, নির্যাতন, ধর্ষনের অপমানে আত্মহত্যার কথা বাদই দিলাম। সেখানে লাশ গুনতে যায় কোন সে স্যাডিস্ট? বাপ এক খানে মেয়ে আরেক খানে তো ছেলে আরেক। কেউ জানেনা কেউ বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। তো আপনি কিভাবে জানবেন মৃতের সংখ্যা? কেউ পেরেছে কোনদিন? না যারা মেরেছে তারা হিসেব রেখেছে? তারা তো পারলে বলে কাউকেই মারা হয়নি।
 
মুচকি হাসে যুবক। বলে আপনি যোগ্যতা অর্জন করেছেন শব্দের উৎস জানার। আসুন আমার সাথে। পেছন পেছন গিয়ে মানুষটি দেখে একটি দরজা। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেলো একটি মানুষকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। মাথা নিচু করে বসে আছে। ততক্ষনে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত। ঘরের অপর একটি দরজা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে একজন ঢুকলো, ঢুকেই চেয়ারের কাছে গিয়ে বিকট শব্দে একটি চড় কষালো। ফিস ফিস করে মহাকাল থেকে যেন সন্তুষ্টির শব্দ ভেসে এলো। এরপর আরেকজন, তারপর আরেকজন। 
 
মানুষটি জিজ্ঞাসা করলো, ইনি কে। যুবকটি মৃদু হেসে বললো, এনার নাম গয়েস্বর রায়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে ফাইজলামি করায় উনার এই শাস্তি। সেই চড়ের শব্দই আপনি পেতেন। মানুষটি অবাক হয়ে বললো এতোদিন ধরে চড় খাচ্ছে? যুবকটি বললো, না, এর আগে তারেক জিয়া ছিলো। চড়ের চোটে  পালিয়েছে। 
 
মানুষটি জিজ্ঞাসা করলেন, আর যে ফিসফিস ভেসে আসা বাতাসে শব্দ? যুবকটি বললো, তাঁরা আমাদের শহীদ, আমাদের তিরিশ লক্ষ পূর্বপুরুষ। প্রতিটি চড়ের শব্দে তাঁদের আত্মা ওপার থেকে সন্তুষ্টি জানাচ্ছেন… আর শুভেচ্ছা দিচ্ছেন এই আমাদের।
 
আমরা? আমরা কারা?
 
আমরা বাঙ্গালী, আমরা বাংলাদেশ, আমরাই ভবিষ্যত।

(বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে)  
Facebook Comments

সৃষ্টির শুরুতে মানুষ ছিলোনা। তাই পাপও ছিলোনা। পাপের জন্মই মানুষের হাতে। তবে কি মানুষ মাত্রই পাপ? নাকি পাপ ও মানুষ যৌথভাবে আপেক্ষিক?

Related posts

One thought on “আমরা কারা?

  1. ব্যাটারে পাইলে আরও কয়েকটা মারতাম

Leave a Reply

Follow us on Instagram