pic-23_27567

একজন সাবেক শিবিরকর্মীর আত্মকাহিনীঃ ছাত্রশিবির, ধর্ম আর আমি!

২০১০ সালের জুন থেকে শুরু । ছোট বেলা থেকেই আমি নামাজ পড়তাম।।এই কারণে মসজিদে যাওয়া হত খুব। এর ফলে পাড়ার সকল বয়সীদের সাথে আমার ভাল সর্ম্পক হয়।।আমার বাড়ি গাইবান্ধা জেলার কোনো এক থানায় হওয়ার কারণে আমি দিন দিন বুঝতে শুরু করলাম এটি বেশ ধর্মীয় দুর্বল মানুষের এলাকা। যাই হোক ধর্ম ভীরুই ছিলাম।

একদিন মাগরিবের ফরজ নামাজ শেষে পাশের এক ভাই দাঁড়িয়ে বললেন “নামাজ শেষে সবাই বসে থাকবেন”। তো ওটাই,নামাজ শেষ সবাই বসে। ওই ভাইয়ের নামাজ একটু দেরিতে শেষ করলেন।তারপর,
আরবি ভাষায় তিনি বেশ কিছুক্ষন কি যেন বললেন। সত্যি কথা হলো আমার ওগুলো ভাল লাগছিল না। তারপর সন্ধ্য বেলা পড়তে হবে। তাই অনুমতি নিয়ে বাড়িতে গেলাম।

পরের দিন সকাল বেলা পাশের বাড়ির একজন যে স্থানীয় মাদরাসায় পড়ত সে এসে আমাকে বলল ‘শোন কাল তো আমি ওগুলো শুনেছি তো যোগ দিতে হবে’। আমিও বেশ কৌতূহলি হলাম বললাম তো যোগ দিয়ে কি করব। ও বলল “দুর সবাই রাজনীতি করে আমরা করলে সমস্যা কি ? আমরা তো আর মিছিল করতেছিনা”। তার পর ইসলামের জন্যই তো,কতজন শহিদ হচ্ছে।তো আমিও ঠিক ভাল বুঝতে না পেরে বললাম কি করতে হবে। ও বলল আগামী শুক্রবার…….. মসজিদে মিটিং হবে ওখানে যেতে হবে। শুক্রবার আসতে ২/৩দিন ছিল। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাড়ি থেকে আমরা তিনজন (আমি, বন্ধু, দাওয়াতকারী) মিলে…. মসজিদে রওনা দিলাম।

যাই হোক নামাজ শেষে দেখি আমরা ৮/৯জন। পরিচয় হলাম। মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম। আগে শুনতাম শিবির নাকি খারাপ মানুষের রগ কাটে। এদের দেখে মানুষ ভয় পায়। ওখানে ছিল ইউনিয়ন সভাপতি, সেক্রেটারি, একজন অতিথি ও আমরা কয়জন। তো সেদিন আমাদের জানানো হলো যে তোমাদের বয়স তো কম যাই হোক তোমরা দিনের পথে কাজ করতে চাও ভাল কথা তো তোমাদের অনেক সমস্যা হতো পারে। ঠিক সেই মুহূর্তে বললাম না সমস্যা নেই। এখন থেকে তোমরা কর্মী। আরো অনেক কথা। সেদিন থেকেই আমাকে একটি ডাইরি দেওয়া হলো। যে ডাইরিতে দৈনিক কাজ, নামাজ এবং পড়াশুনা নিয়ে বেশ সুন্দর সিস্টেম রয়েছে। যাই হোক, এভাবেই শুরু হলো আমার রাজনীতিক জীবন। বেশ কয়েক মাস পর আমার পরিচিতি বাড়ল। মাসে প্রায় আমি ৫/৬টি মিটিং করতাম। তো একদিন আমাকে উপজেলা কার্যলয়ে ডেকে নেওয়া হল। এর মধ্যে বাদ পড়ল,আমাকে যে ডায়রি দেওয়া হয়েছিল তা প্রতি মিটিংএ দেখত। এবং তা দেখে খুশি হত। আমি এর মধ্যে অনেক তথ্যই ভুল দিতাম। যেমন নামাজ,ভাল কাজ, নিজের লেখা পড়া ইত্যাদি। আমাকে ডাকার পর আমাকে ইউনিয়ন সেক্রেটারির পদ দেওয়ার কথা হলো। জানিনা, আমি মেধাবী কি না তবে তারা অনেক মেধাবী ভাবত। আমি বেশ খুশি। পদ দেওয়ার কারণ হলো, তখনকার সেক্রেটারি লেখাপড়ার জন্য পাশের জেলা বগুড়ায় আজিজুল হক কলেজে যাচ্ছিল। তো আমাকেই তারা যোগ্য মনে করছিল।

আমি দিন দিন স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়, যেমন মিটিং,মিছিল,চাঁদা আদায়,ইত্যাদি। এলাকাতেও আমার নাম ছড়িয়েছ। নিজেকে ভালো লাগত। দিন দিন আমি মিটিং করার ফলে উপরে পর্যন্ত আমার ভাল নাম ডাক ছড়িয়ে ছিল। কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তখন কার সভাপতি দেলোয়ার হোসেন সফর এসেছিলেন বগুড়ায়, সেখানে তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। যেটা খুব সহজ ছিল না। তাদের সাথে কথা বলে যেটা বুঝলাম ধর্ম বড় না তাদের মুল বিষয় হলো সরকার পতন আর ক্ষমতা লাভ। দিন দিন লক্ষ্য করলাম যে আমি যে কারণে রাজনীতি শুরু করলাম বা যা বলা হয়েছে তা থেকে আমি বা তারা অনেক দূরে। এবং প্রায় সবাই। কেউ নামাজ নিয়মিত পড়েনা অথচ নামাজ নামাজ করে।ইসলামের আইন চালুর কথা বলে ক্ষমতার জন্য লড়ে। আমার বুঝতে বাকি রইল না যে এটি। এভাবেই চলছিলাম আমি।

এদিকে দেশের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। আমাদের প্রায় সকল নেতাদের কে জেলে নেওয়া হয়েছে। তাদের বিচার চলছিল। এর সাথে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি । এমন অবস্থায় প্রায় হরতাল হত। লোক ভাড়া করতাম। একদিন পুরো হরতাল পালন করা লাগেনা। সকালে একটু দিলেই হয়। যাদের ভাড়া করতাম এরা দুপুর পর্যন্ত থাকত। ৫০ থেকে শুরু করে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত দিতাম। প্রায় হরতালে আমি ১০ থেকে ১৫ জন কে নিয়ে যেতাম।দিন শেষে আমার কিছু থাকত। কোনো ঝামেলা হলে দায় নিতে হত। এদিকে আমার নামাজ নেই সারাদিন শুধু এগুলো নিয়ে ভাবতাম। আর কাউকে এগুলো(নামাজ) নিয়ে চিন্তা করতেও দেখিনি। তখন থেকেই বুঝলাম শিবিরের রাজনীতি ধর্মের জন্য নয় শুধু ক্ষমতার জন্য। আমাদের নেতাদের বিচারের রায় শুরু হলো আর তখন থেকে গনজাগরণ সৃষ্টি হলো এবং রায় হচ্ছিল আর হরতাল হচ্ছিল।

আর সেই সময় গাইবান্ধার রাজপথ বেশ গরম ছিল। সাঈদীর রায়ের দিনে গাইবান্ধায় দুজন পুলিশ মারা যায় আর সেই হরতালে আমিও ছিলাম। দেখেছি কিভাবে শিবির তার কথিত আর্দশ ধ্বংস করেছে। র্নিমম ভাবে পুলিশ দুটাকে হত্যা করা হয়।পুলিশের কোনো দোষ ছিলনা। যদিও আমি জড়িত তবুও বলব ঠিক হয়নি। মামলা হয়েছে স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। যদিও ঘটনা আমাদের ছিল। মামলা যখন স্থানীয় নেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছিল ঠিক সেই সময় আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হল অর্থ সম্পাদকের। আর আমার সময় সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি হয়েছিল ১৮ দলের অবরোধে গাইবান্ধার রেল সহিংসতা । যেখানে ৫জনের বেশি নিহত হয়। এটি আমাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়। এই ঘটনার পূর্বে বিকাল বেলায় আমার কাছ থেকে সেক্রেটারি ১৬০০টাকা নেয়।  আর এই টাকায় ঘটনার যোগান দেয়। যদিও আমার কাছ থেকে অন্য খরচ বাবদ নেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে ২ লোভী শিবির কর্মী আটক হয়। আর এই ঘটনার কয়েকদিন পর আমি ছাত্রশিবির এর সকল কার্যক্রম হতে অব্যাহতি নেই।

আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি ছাত্রশিবিরের সহিংসতা, যে কিভাবে তারা সহিংসতা ছড়ায় আর অর্থ যোগান দেয়। এরা যে চাঁদা দেয় বা নেয় তা সংগঠন চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়,অর্থের জন্য এদের বড় একটা ফান্ড রয়েছে। শিবির কে নির্মুল করতে হলে এদের অর্থ বন্ধ করার পাশাপাশি সামাজিক ভাবে এদের উদ্দেশ্য কে প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ এটা অস্বীকার করার কারণ নেই যে এটা মেধাবীদের সংগঠন। আমি জীবনে যা ঘৃণা করি তাই যেন শিবিরের আর্দশ। এদের অপর্কমের শেষ নেই। সহিংসতা কে আমি ঘৃণা করি। আর সারা জীবন করেই যাব। তবে শিবির আমার দৃষ্টি ভঙ্গি পালটে দিয়েছে শিবির সম্পর্কে। শিবিরে যোগদান না করলে হয়ত বা তা দেরিতে হত। আমি আমার বর্তমান ধর্মীয় দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে খুশি। আজ আমি স্বাধীন।। আমার মত আজ স্বাধীন।

( ফেসবুক ইনবক্স থেকে পাওয়া সাবেক শিবির কর্মীর এই আত্মকাহিনী। সঙ্গত কারনে নাম ঠিকানা গোপন রাখা হলো। যে ভাষায় সে লিখে দিয়েছে সামান্য কিছু বানান সংশোধনব্যাতীত তা অপরিবর্তিত অবস্থায় প্রকাশ করা হলো। )

dakbaksho.me@gmail.com

Facebook Comments

সৃষ্টির শুরুতে মানুষ ছিলোনা। তাই পাপও ছিলোনা। পাপের জন্মই মানুষের হাতে। তবে কি মানুষ মাত্রই পাপ? নাকি পাপ ও মানুষ যৌথভাবে আপেক্ষিক?

Related posts

4 thoughts on “একজন সাবেক শিবিরকর্মীর আত্মকাহিনীঃ ছাত্রশিবির, ধর্ম আর আমি!

  1. সামইনে আনাস তার জীবনের কয়েকটি পর্ব লিখেছিলো। সেখানে অবশ্য এমন সহিংস ঘটনা ছিলো না।

  2. গাঁধার বাচ্চার মন্ডুতে ছাগলের মস্তিস্ক, আমাদের দেশে মানুষরুপী ছাগলের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে,
    রাত জেগে ছাগলের রচনা লিখতে চাইনা,
    শুধু একটা কথাই বলতে চাই , তা হল – ইসলাম ধর্ম এতটা কঠিন না ,,,,, আর তারাও মুসলীম না যারা ধর্ম নিয়ে ব্যাবসা করেন ৷ বিঃদ্রঃ- গাধা ও ছাগল তাদেরকেই বলা হয়েছে , যারা অনবরত রাসূলের সুন্নাতের অবমাননা করে চলেছেন নিজের অজান্তে৷দাঁড়ি রাখলে আর টুপি মাথায় দিলেই মুসলমান হওয়া যায়, I mean (দ্যাখতে মুসলমান মনে হয়) কিন্তু মানুষ হওয়া যায়না৷ তাই বলি আগে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেন, আর মুসলমান? সে তো অনেক সাধনার ফসল, শিবির ছেড়ে শান্তির পথে আসেন নয়তো ছাগল অবস্থায় মৃত্যুবরন করার 100%সম্ভাবনা রয়েছে৷(পরম করুনাময় আপনাদের হেদায়েত করুন) আমিন৷

  3. শিবির কি দোয়া তুলসী পাতা?
    ভাল মানুষ হতে হলে শিবির করা লাগে না।আল্লহকে ভয় করলে হই।।

Leave a Reply

Follow us on Instagram