IMG_20160327_171715

দেয়ালের শরীরে জীবন

 

বিথীর সকাল থেকে মেজাজ খারাপ। কেউ যদি ওকে কল দিয়ে না পেয়ে পরে আর ফোন না ধরে, বিথীর ভয়াবহ মেজাজ খারাপ হয়। সকালে অনিন্দ্য ফোন দিয়েছিলো। ফোন বেডরুমে রেখে ও রান্নাঘরে গিয়েছিলো। ফিরে এসে দেখে দুইটা মিসকল। তখনই একবার ফোন দিয়েছিলো, ধরেনি অনিন্দ্য। তারপর সারাদিনে আরো বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছে। বেজে বেজে কেটে গেছে।

বহুদিন পর নিজের নাম্বার থেকে ফোন দিলো অনিন্দ্য। অথচ ও কথা বলতে পারলো না। কিজন্য ফোন দিয়েছিলো? উহু, ভেবে পায় না বিথী। হয়তো এমনিতেই। হয়তো কোন জরুরী কাজ। তাহলে ফোন ধরবে না কেন? ধুত! আর ফোন করবে না ও। কারো দরকার থাকলে সে নিজেই ফোন দিবে। আমার কি ঠেকা পড়েছে? ভাবে ও।

রান্না করা দরকার। ভোরে বাজার থেকে চিংড়ি মাছ, রুই মাছ আর মুরগী কিনে এনেছে। দোকানদার বলেছিলো রুই মাছের পেটে ডিম নেই। অথচ বাসায় এসে কেটে দেখে পেট ভর্তি ডিম! প্রায় চার কেজি মাছের এক কেজিই ডিম হবে হয়তো। অই দোকানদারের কাছ থেকে আর মাছ নেবেনা মনে মনে ঠিক করলো ও। দুপুরে শুভ আসবে না। তাই রান্না করতে আলস্যি লাগছে। বিছানায় শুয়ে থেকে আরেকবার ট্রাই করে অনিন্দ্যের নাম্বারে। রিং বাজতে বাজতে কেটে যেতে কানের কাছ ফোন ধরা অবস্থাতেই কল এলো। ফোনের ভাইব্রেশনে চমকে ওঠে বিথী। সামনে ধরে দেখে মা ফোন করেছে। রিসিভ করে কানে ধরে বললো

-কি অবস্থা মা? তোমার শরীর কেমন?

– এইতো চলছে রে। কি করিস তুই?

– রান্না করি মা। চিংড়ির মালাইকারী করলাম। এবার চাইনীজ শব্জি রাঁধবো। শুভ পছন্দ করে খুব।

– জামাই কই? অফিসে?

– হু মা। আমি জেলখানায় আর তোমার রাজপুত্র জামাই অফিসে। রাজ্য উদ্ধার করছে।

– এভাবে বলিস কেন? শুভ না থাকলে আজ তোর কি হতো ভেবেছিস কখনো?

– ঘুটেকুড়ানির মেয়ের আর কি হতো? কুঁড়েঘরেই নাহয় জীবন কাটতো। জেলখানায় তো আর থাকা লাগতো না। তাই না?

– তুই আমারে ঘুটেকুড়ানি বললি?

– নাহ, ভুল বলেছি মা। তুমিতো দুয়োরানী। মহারানী। তবে দুঃখের রানী।

– তুই দিন দিন অনেক বেশি কথা বলা শিখেছিস। তোর বাপ বেঁচে থাকলে… গলায় বাস্প জমে মা’র।

– তুমি কি আবার কান্নাকাটি শুরু করলে? হ্যালো, হ্যালো… মা দেখো এভাবে ফোন করে কান্নাকাটি করলে কোনদিন কিছু একটা করে ফেলবো দেখো।

– কর না, তোর বাপের মতো কিছু একটা করে বেঁচে যা। আমি পঁচে মরি।

– মা, তোমার সাথে পরে কথা বলবো। রান্না শেষ করতে হবে।

– রাখ। আর কোন পাগলামি করবি না। শুভর দিকে খেয়াল রাখিস।

– আচ্ছা আচ্ছা। এখন রাখি।

 

ফোন রেখে দিয়ে বিথী চিৎ থেকে উপুড় হয়ে শোয়। নাহ, বিকাল হয়ে যাচ্ছে। রান্না শেষ করে রাখতে হবে। শুভ খিদে সহ্য করতে পারে না। এসে খাবার না পেলে চিল্লাচিল্লি শুরু করবে। মারধর করবে। গত পরশুর কালসিটে দাগটা এখনো মোছেনি। কনুই এর ঠিক উপরে সগৌরবে শুভর পৌরুষের এলান করছে যেন চিৎকার করে।

 

বিথী খুব শক্ত টাইপের মেয়ে। সে এগুলো কাউকে বলে না। মাঝে মাঝে একা একা কাঁদে। শুভ অফিস যাবার সময় দরজায় তালা দিয়ে যায়। প্রথম প্রথম জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু কিছুদিন পর খেয়াল করলো পাশের বাসার ইন্টারে পড়া ছেলেটা এতে খুব উৎসাহ পেয়েছে। বারান্দায় এসে প্রায়ই ট্রাউজারের উপর দিয়ে বিশেষ অঙ্গ চুলকাতো ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে। ব্যাপারটা টের পাবার সাথে সাথে ও সেই জানালাও বন্ধ করে দিয়েছে। একমাত্র সঙ্গী মোবাইল ফোন ও ঘরের সনি টিভিটা। টিভিটা অন করে স্ক্রীণের দিকে তাকিয়ে থাকে। টিভিতে কি হচ্ছে সেটাতে ওর তেমন আগ্রহ নেই। ওর জগতে একমাত্র চলমান ও রঙ্গিন বস্তু টিভি। সারাদিন বাসার সকল ফার্নিচার ও হাড়ি পাতিলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র টিভিতে কিছু নড়াচড়া দেখতে পায়। সেটাই ওর দেখার বিষয়। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় মায়ের সাথে। এক বান্ধবী আছে কলেজের, তার সাথেও কথা হয়। শুভ ফোন চেক করে। আর কারো সাথে কথা বলার উপায় তেমন নেই। মাঝে মাঝে সন্দেহ হলে মাস শেষে কললিস্ট তুলে নিয়ে আসে শুভ। নাম্বার মিলিয়ে দেখে কার সাথে কথা বলছে ও।

অনিন্দ্য ওর কলেজের বন্ধু ছিলো। কলেজে থাকতে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি সে বিথীকে পছন্দ করে। সবার বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড ছিলো, অনিন্দ্য আর বিথী ছিলো ব্যতিক্রম। অনিন্দ্যকে জিজ্ঞাসা করলে ও বলতো, “আমি একবারে বিয়ে করবো। প্রেম ভালোবাসা বিয়ের পর”। বিথী জানতো ওর বিয়ে করা হবেনা। পরিবারের ভার ঘাড়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো ও। নিজের পড়াশোনা টিউশনি করেই চালাতো। ছোটবোনেরটাও ওর দ্বায়িত্ব ছিলো। মনের মাঝে কোন কোন সময় দোলা লাগতো না, তা না। লিখন স্যার, কিংবা কলেজের পাশের ফটোকপির দোকানদারটা… হাত বাড়াতো অনেকেই। লিখন স্যার বিবাহিত ছিলো। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে এসেছিলো পড়ার ঘর থেকে। স্যার অবশ্য পড়ানোর জন্য টাকা নিতেন না। কিন্তু ও আর যায়নি কখনো সে ঘটনাটার পর। ফটোকপির দোকানদার ছেলেটা অবশ্য সরাসরিই বলেছিলো, ওকে বিয়ে করতে চায়। দোকানটা আরেকটু বড় করবে। দুইটার জায়গায় চারটা মেশিন দেবে। কিছু ফাস্টফুড তুলবে। কিন্তু সাড়া দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি বিথী। মা আর ছোটবোনটার কি হবে?

কিন্তু অনিন্দ্যের কথা ভাবেনি সে কখনোই। ওদের মতো গরীব না হলেও অনিন্দ্যের পরিবারের অবস্থাও খুব বেশি ভালো ছিলো না। অনিন্দ্যের বাবা রাজনীতি করতেন। জেলা আওয়ামীলীগের কি যেন ছিলেন। ব্যবসা একটা ছিলো বটে। তবে সেটায় সঠিক নজরদারীর অভাবে কর্মচারীরা বড়লোক হতে থাকলো। অনিন্দ্যের এসব মাথাব্যাথা ছিলো না। গান, আবৃত্তি, ক্রিকেট, কলেজের প্রোগ্রাম… এসব নিয়ে খুব ব্যাস্ত। ওদের শেষ দেখা হয়েছিলো রেজাল্টের দিন। হঠাৎ অনিন্দ্য ওকে বলে,

– এই শোন তো এদিকে।

– কি?

– পাস করেছিস না?

– হু। তুই তো ভালো রেজাল্ট করলি দেখি। তলে তলে এই লুকিয়ে রেখেছিলি? হি হি হি।

– ফাজলামো রাখ। আমাকে বিয়ে করবি?

– কি?

– হু, বিয়ে করবি? নখ দাঁতে খুটতে খুটতে অনিন্দ্য অন্যদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো। বিথী কি বলবে ভেবে পায় না। আস্তে করে বলে,

– আমি এখন আসি।

– উত্তর দিবিনা?

– না। উত্তর দেয়ার কিছু নেই।

– আচ্ছা। কাল কলেজে একবার আসিস। কথা আছে।

যায়নি বিথী। পরের সপ্তাহে বিয়ে হয়ে যায় বিথীর। শুভ মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ। বিয়ের জন্য একটা কাজের মেয়ে খুঁজছিলো, চেহারা সুন্দর দেখে। গায়ের রঙ টা কাজে লেগে গেলো বিথীর। বিয়ের সময় শুভ কথা দেয় ওর মা কে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে। বিথী নিশ্চিন্ত হয়ে বিয়ে করে ফেলে শুভকে। অফিস থেকে ওষুধের স্যাম্পলস যা দিতো সেটা বেচে ওর মা কে টাকা পাঠাতো শুভ। সেজন্য বিথীকে কোন টাকা দিতো না। ও টাকা চাইলে বলতো, “তোর মায়ের কাছে পাঠিয়েছি, চেয়ে নিস”।

বিথীকে একটা মোবাইল কিনে দিয়েছিলো শুভ। ফিল্ড থেকে মাঝে মাঝে ফোন করে খোঁজ খবর নেয়, কি রান্না করতে হবে বলে দেয়। হঠাৎ একদিন অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো।

– কিরে, ফাঁকি দিয়ে বিয়ে করে ফেললি? পুরুষ কন্ঠ শুনে দ্বিধান্বিত হয় বিথী। অনিন্দ্য মনে হচ্ছে, কিন্তু ও নাম্বার পাবে কোথায়?

– কে বলছেন?

– ওহ, ভুলে গেছিস বিয়ে করেই? বললাম তোকে বিয়ে করবো, আর তুই পালিয়ে গেলি? আমি কি এতোটাই খারাপ ছিলাম রে? কালো বলে বাদ দিয়ে দিলি? হা হা হা হা!

– অনিন্দ্য, আমার নাম্বার পেলি কই তুই?

– তোর ছোট বোনটার সাথে দেখা হয়ে গেছিলো। বললাম তোর কথা। ও নাম্বার দিলো। জানিস, আমি বিশাল চাকরী করি। মেলাটাকা বেতন!

– হু, ভালো তো। তা বিয়ে করিসনি?

বন্ধ বাতায়নের ফাঁক গলে বদ্ধ বাতাসে দোল ওঠে দখিনা হাওয়ার। মোবাইলের ছোট্ট স্পিকারের ফাঁক গলে ভেসে আসে কামিনী ফুলের সুবাস। মাতোয়ারা হয় বিথী। বুক ভরে শ্বাস নিতে চায় ও। খোলা মাঠে দৌড়ে বেড়াতে চায় মুক্ত হাওয়ার মত। শুভ একদিন বলে ওঠে, “মোবাইল ওয়েটিং ছিলো কেন?” বিথী মায়ের কথা বলে কোনরকমে এড়িয়ে যায়। তারপর থেকে শুভ ওর মোবাইল চেক করে। অনিন্দ্য ভিন্ন ভিন্ন নাম্বার থেকে ফোন করতে থাকে এরপর থেকে।

কিছুদিন হলো, ও ভাবছে পালাবে। কবে, তা জানে না। কিভাবে তাও জানে না। শুধু ভাবছে পালাবে। অনিন্দ্যকে বলেছে। অনিন্দ্য বলেছে, “তুমি আঁচল উড়িয়ে এসো রানী, আমি দু হাত বাড়িয়ে থাকবো তোমার অপেক্ষায়”।

আচ্ছা, কাজটা আজ করলে কেমন হয়? শুভর আসতে আজ একটু দেরী হবে। কিভাবে পালানো যায়? বিথী জানালার কাছে গিয়ে পাল্লা খুলে দেয়। পাশের বাসার ছেলেটা কই? একটু পরেই ছেলেটাকে দেখে বারান্দায় আসতে। ওকে দেখে একগাল হেসে হাত বাড়াচ্ছিলো দু পায়ের মাঝখানে। ওর পালটা হাসি দেখে থতমত খেয়ে যায় ছেলেটা। বিথী ছেলেটাকে ইশারা করে ওর বাসার দরজায় আসতে। ছেলেটা সেটা দেখেই এক দৌড়। বিথী দরজায় গিয়ে কান পাতে। এখনো আসে না কেন ছেলেটা? দেরী করে কেন! অস্থির হয়ে যায় বিথী। একটু পর পায়ের শব্দ শোনে। ফিস্ ফিস্‌ করে বলে ওঠে,

– এসেছ? দেরী হলো কেন?

– হ, মোড়ের ফার্মিসিত গেছিলাম। মাগার দরজায় তো তালা লাগাইন্যা। অখন কি হরুম?

– একটা তালাওলা ডেকে নিয়ে এসো।

– শুভ ভাই ট্যার পাইলে আম্রারে জবেহ দিয়া দেবেনে। বিথী একটু আদুরে সুরে বললো,

– এহ, বীরপুরুষ। এইটুকু করতে পারবা না?

– হ হ পারুম। আপনে খাড়ান, আমি লৌড় দিয়া যামু আর আসুম।

একটু পর খুটখাট শব্দ শোনে বিথী। মোবাইল, দু একটা গয়না আর পঞ্চাশটা টাকা নিয়ে ঢোকায় হ্যান্ডব্যাগে। আর একটা ব্লেড নেয় হাতের আড়ালে। টের পায় দরজাটা খুলে যাচ্ছে। একটু আড়ালে যায়। চাবিওয়ালা চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে বিথী। ছেলেটা পা টিপে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগানোর উপক্রম করতেই বিথী পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে জায়গামতো ব্লেড ধরে। হিস হিস করে বলে ওঠে,

– দরজা খুলে সরে দাড়া শুয়োরের বাচ্চা, নইলে গোড়া থেকে কেটে একেবারে নামিয়ে দেবো।

– ইয়াল্লা মার কসম ভাবী আমি কিচ্ছু করুম না। হুদাই গপ মারতে আইছিলাম।

– সর কুত্তার বাচ্চা, সরে দাঁড়া।

ছেলেটা সরে দাঁড়াতেই বিথী বের হয়ে দরজার শিকল লাগিয়ে দেয় বাইরে থেকে। ভেতর থেকে অস্রাব্য গালাগাল আর দরজায় কিল ঘুসি পড়তে থাকে।

বিথী বের হয়ে রিক্সা নেয়। আবার ফোন দেয় অনিন্দ্যের নাম্বারে। ফোন বাজতে থাকে, কিন্তু কেউ কেন জানি রিসিভ করে না।

 

পরদিন পত্রিকায় একটি লাশের ছবি সহ খবর ছাপা হয়।

“… জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতির ছেলে অনিন্দ্য খান অফিসে যাবার সময় অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। লাশের হাতে তার নিজের মোবাইল ফোনটি মুঠোবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। ঘটনার সময় একটি নাম্বারে কল করা হয়েছিলো তাঁর মোবাইল থেকে। পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। ধারণা করা হচ্ছে রাজনৈতিক বিরোধীতার দরূন এই হত্যাকান্ড। এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপারের সাথে যোগাযোগ করা হলে…”

Facebook Comments

সৃষ্টির শুরুতে মানুষ ছিলোনা। তাই পাপও ছিলোনা। পাপের জন্মই মানুষের হাতে। তবে কি মানুষ মাত্রই পাপ? নাকি পাপ ও মানুষ যৌথভাবে আপেক্ষিক?

Related posts

Leave a Reply

Follow us on Instagram